বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ফরমালিনমুক্ত পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে রাজধানীর ১১টি বাজারে ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্র বসানো হলেও বাস্তবে তার ব্যবহার নেই। এমনকি যন্ত্রগুলোর ব্যবহার হচ্ছে কিনা তারও তদারকি নেই। বাজারগুলো ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। আর সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, বাজারগুলোকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করেই দায় সেরেছে ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
জানা গেছে, গতবছর দুবছরে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই রাজধানীর ১১টি বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করে। বিভিন্ন ব্যাংকের সহায়তায় ওই ১১টি বাজারে ফরমালিন সনাক্তকরণ যন্ত্র ফরমাল ডিহাইড ডিটেকটর বিনামূল্যে সরবরাহ করে।
এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১২ সালে রাজধানীর মালিবাগ বাজারে ফরমালিন সনাক্ত করার যন্ত্র ফরমাল ডিহাইড ডিটেকটর হস্তান্তরের মাধ্যমে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর একে একে বাকি বাজারগুলোকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই ঘোষণার কোনো বাস্তব সুবিধা পাচ্ছেন না ক্রেতারা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এফবিসিসিআই’র ঘোষিত ফরমালিনমুক্ত বাজারে ফরমালিন পরীক্ষার কার্যক্রম নেই। এমনকি স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নিয়োজিত যেসব ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদেরও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘোষিত ফরমালিনমুক্ত বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহে একদিন ফরমালিন পরীক্ষা করা হয়। মিরপুর-১ বাজারের দধি ব্যবসায়ী মো. আজিজ জানান, ফরমালিন চেক করতে দেখেননি তিনি। বাজারের ভেতরের ইয়াহিয়া ব্রয়লার হাউজের বিক্রেতা মো. মোমিন জানান, দীর্ঘদিন আগে একবার পরীক্ষা করতে দেখেছেন। এরপর আর ফরমালিন পরীক্ষা করতে দেখেননি তিনিও। একই বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. সোহাগ জানান, ক্রেতারা অভিযোগ করলে পরীক্ষা করা হয়।
এ বিষয়ে মিরপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির হারুনুর রশিদ বলেন, সপ্তাহে ১-২ বার পরীক্ষা করা হয়। আর কোনো ক্রেতা অভিযোগ করলে পরীক্ষা করে দেন তারা। ওই বাজারে ‘ফরমালিন নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।
ফরমালিনমুক্ত আরেক বাজার মহাখালী কাঁচা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, যে অফিসে ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় তা বন্ধ এবং যিনি পরীক্ষা করেন তিনি ছুটিতে আছেন। এই বাজারের ব্যসায়ীরা অভিযোগ করেন, ফরমালিন তেমন চেক করা হয় না। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালত গিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন।
শান্তিনগর বাজারে গিয়ে পাওয়া যায় একই চিত্র। মাঝে মধ্যে ফরমালিন পরীক্ষা করা হয়। নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না।
ব্যবসায়ী সমিতিতে গিয়েও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ফরমালিন পরীক্ষা করার জন্য আলাদা লোক রয়েছে।
মিরপুর কাচাঁ বাজারে কথা হয় নিয়মিত ক্রেতা ভূতত্ত্ববিদ সাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজারে আসি, মাছ-মাংস কিনে নিয়ে যাই। এতে কি আছে তা আমরা জানি না। ফরমালিন মিশালে ক্রেতার বোঝার উপায় নেই। এজন্য কর্তৃপক্ষের মনিটরিং বাড়ানোর উচিৎ।
মিরপুরের ব্যবসায়ী সমিতির একজন কর্মকর্তা জানান, ফরমালিন শুধু মাছে নয় প্রত্যেক প্রকার ফলেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলের মধ্যে আম, আনারস, লিচু ইত্যাদিতে বেশি ফরমালিন পাওয়া যায়।
ফরমালিন পরীক্ষা সম্পর্কে মোহম্মদপুর টাউন হল সিটি করপোরেশন বাজারের ভেতরে মোরশেদ প্যাকেজিং স্টোরের স্বত্বাধিকারি মো. মোরশেদ জানান, তেমন চেক করতে দেখিনি।
ব্যবসায়ী সমিতির এক ব্যক্তি জানান, প্রতি মাসে দু’একবার পরীক্ষা করা হয়। তবে সভাপতি, সেক্রেটারি এবং ফরমালিন সনাক্তকারী দফতর সম্পাদক খোকা মিয়া কাউকেই পাওয়া যায়নি।
এদিকে নগরীর এ বাজারগুলোকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করতে এবং ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্র সরবরাহে অগ্রণি ভূমিকা পালন করেছিলেন এফবিসিসিআই‘র সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার দাবি, ফরমালিনের ব্যবহার এখন কমে গেছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। যেসব বাজারে ফরমালিন পরীক্ষার মেশিন দেয়া হয়েছে সেখানে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফরমালিন পরীক্ষার জন্য আলাদা কোনো লোক নিয়োগ দেয়া হয়নি। তারপরও বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে তারা পরীক্ষা করেন। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন করে আমদানি বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। আইন পাশ হয়ে গেলে ফরমালিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
প্রসঙ্গত, ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে ফরমালিন আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ, বিক্রয় ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিকর পদার্থ হিসেবে অপব্যবহার রোধে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন অনুমোদন করতে যাচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে ২০১৩ সালের ২০ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি খসড়া তৈরি করে যা সংসদে পাশের অপেক্ষায় আছে।
ফরমালিন নিয়ে এক সেমিনারে ব্যবসায়ীরা খাবারে ফরমালিন ব্যবহারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের দাবি জানান। এর উত্তরে আইনমন্ত্রী যাবজ্জীবন শাস্তির বিধান করার কথা বলেন।(আমাদের সময়.কম)
