বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর হোটেল রূপসী বাংলার সংস্কার নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হোটেলটি পুরোপুরি বন্ধ করে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর থেকে সংস্কার কাজ শুরু হবে। এ কাজ চলবে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এ দীর্ঘ সময় প্রায় ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কি করবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, কাজ না করলেও এ সময় বেতন-ভাতা ঠিকই পাবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন এ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করতে পারছেন না। সংস্কারের পর পুরো ব্যবস্থাপনাই বদল হবে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপ ৩০ বছরের জন্য এর নিয়ন্ত্রণ নেবে। শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের আশঙ্কা মালিকানা বদল হওয়ায় তাদের চাকরি যাবে- এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ জন্য কর্তৃপক্ষ হোটেলটি পুরোপুরি বন্ধ করে কাজ শুরু করবে।
সংস্কারের কারণে হোটেলটির কক্ষ সংখ্যাও কমে যাবে। বর্তমানে কক্ষ সংখ্যা ২৭২টি। সংস্কারের পর তা থেকে কমে দাঁড়াবে ২২৬টিতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি কক্ষ সংস্কারের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। শ্রমিক গ্রুপের আশঙ্কা, বন্ধ করে হোটেলটির সংস্কার করলে ব্যাপক দুর্নীতি হতে পারে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এবং ১৯৯২ সালে সংস্কার করা হলেও হোটেলটি খোলা ছিল। হোটেলটি সংস্কারে জুনেই আন্তর্জাতিকভাবে টেন্ডার আহ্বানের কথা। সব অর্থই বাংলাদেশ সরকারের অগ্রণী ব্যাংক পরিশোধ করবে।
হংকং ভিত্তিক প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ‘ইন প্রজেক্টস’ সার্বিক কাজ তত্ত্বাবধায়ন করবে। বাংলাদেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল বর্তমানে ‘রূপসী বাংলা হোটেল’-এর স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেড (সিএসএল)। এটি শুরুতে ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ নামে যাত্রা শুরু করে। পরে ‘ঢাকা হোটেল শেরাটন’ নামে পরিচালিত হয়। সমপ্রতি বিএসএল কর্তৃপক্ষ বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত হোটেল ম্যানেজমেনট কোম্পানি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপ (আইএইচজি)-এর ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ ব্র্যান্ডের সঙ্গে ৩০ বছরের জন্য চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুযায়ীই সংস্কার কাজ শুরু হবে। কিন্তু শ্রমিক পক্ষ এর তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, সংস্কার করা হোক তাতে আমাদের কোন দাবি নেই।
কিন্তু বন্ধ করে সংস্কার করা হলে শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ বেকার হয়ে পড়বে। তবে মালিক পক্ষ বলছে, সংস্কার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা বেতন-ভাতা ঠিকই পাবেন। বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, এত টাকা দিয়ে হোটেলটির সংস্কার করার কোন মানে হয় না। তার মতে, বরং নতুন করে আরেকটি হোটেল নির্মাণ করাই ভাল। হোটেলটির সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল বিভাগের অধ্যাপক ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, সংস্কার করা হচ্ছে চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী। এখানে ব্যাপক পরিবর্তন হবে। তাই বন্ধ করা ছাড়া কাজ করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, খোলা রেখে কাজ করলে নানা সমস্যা হতে পারে।
ব্যাপক সংখ্যক লোক কাজে নিয়োজিত থাকবে। বন্ধ করা ছাড়া কাজ করলে হোটেলে যারা অবস্থান করবে তাদের জন্য ঝুঁকি হতে পারে। ৪৩ মিলিয়ন ডলার বা ৩৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে হোটেল সংস্কারের বিষয়ে অধ্যাপক ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতেই এবং চুক্তির শর্ত হিসেবেই এ কাজ করা হচ্ছে। এ টাকা দিয়ে নতুন আরেকটি হোটেল করা যেতো কিনা- এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আহমেদ বলেন, সেটা অন্য বিষয়। বর্তমানে হোটেলটির মূল ভবন করা হয় ২০০১ সালে। উদ্বোধন করা হয় ২০০৩ সালে। কাজের দায়িত্ব প্রথমে পেয়েছিল ‘আরব কনস্ট্রাশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কাজ না করেই এ প্রতিষ্ঠান ৯ কোটি টাকা নিয়ে যায়। পরে আরেকটি প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে কাজ শেষ করে। ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। বেশির ভাগ অংশই ফেটে গেছে। উপর থেকে বালি পড়ে।
হোটেলটির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) জেমস পি. ম্যাকডোনাল্ড বলেন, সংস্কারে দীর্ঘ সময় লাগলেও পুরো সময় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা পাবেন। তিনি বলেন, সংস্কারের ফলে হোটেলটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। সুযোগ-সুবিধাও অনেক বাড়ানো হবে। অন্যদিকে পুরোপুরি বন্ধ রেখে সংস্কারের বিরোধিতা করছে শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন। তারা তাদের যুক্তি তুলে ধরে ২০শে এপ্রিল বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীকে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছেন। শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, তাদের অন্ধকারে রেখেই সংস্কার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৮ই মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি বৈঠক করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতে শ্রমিক ইউনিয়নের কোন প্রতিনিধি ছিলেন না। রূপসী বাংলা হোটেল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. সফিউদ্দিন বলেন, হোটেলটি বন্ধ করে সংস্কার করা হলে শ্রমিকদের একটা বিরাট অংশ চাকরি হারাতে পারে। তিনি বলেন, এত টাকা দিয়ে নতুন আরেকটি হোটেলই করা যায়। বন্ধ করে সংস্কার করা হলে ব্যাপক হারে দুর্নীতি হতে পারেও বলে মন্তব্য করেন তিনি। মানবজমিন
