বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে মোটামুটি একই রকম- বিক্রি নেই, টাকা নেই, নতুন নিয়োগ নেই। উল্টো পুরনো কর্মীদের বিদায় করে টিকে থাকার চেষ্টায় আছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই বেতন অনিয়মিত হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোরবানির ঈদে বোনাস হয়নি। প্রতিষ্ঠানের করুণ দশা দেখে কর্মীরাও মালিকের কাছে বোনাস চায়নি। সুদিনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে সবাই।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে আছে তাদের অন্য ব্যবসার ওপর ভর করে। চার-পাঁচটি খাতে যাদের ব্যবসা আছে তারা একটি-দুটি খাতে ভালো ব্যবসা করে সেই টাকা ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে নিজেদের আবাসন ব্যবসায়। তবে, তাদের মনেও প্রশ্ন- এ অবস্থা আর কতকাল চলবে।
শ্রম জরিপ ২০১০ অনুসারে ২০০২-০৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় চার কোটি ৪৩ লাখ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা প্রায় চার কোটি ৭৪ লাখে দাঁড়ায়। ২০১০ সালে কর্মরত লোকের সংখ্যা বেড়ে প্রায় পাঁচ কোটি ৪১ লাখ হয়েছে। বছর বছর কর্মরত লোকের সংখ্যা বাড়লেও জনসংখ্যা অনুপাতে তা বাড়ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা ও বেকারত্বের হার বাড়ছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। ২০১০ সালে তা ২৬ লাখে দাঁড়ায়। ২০০২-০৩ অর্থবছরে বেকারত্বের হার ছিল ৪.৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৪.৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশে মাত্র ২৬ লাখ মানুষ বেকার। এর সঙ্গে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে প্রায় তিন কোটি ৪৫ লাখ মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে ছিল। ২০১০ সালে তা বেড়ে প্রায় তিন কোটি ৮৯ লাখে দাঁড়ায়।
ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বার্ধক্য এখন বড় সমস্যা। জাপান বহুদিন ধরেই সমস্যায় আছে শ্রম দিতে সক্ষম জনবলের অভাবে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার মধ্যে তরুণ কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেশি। সর্বশেষ শ্রম জরিপ অনুযায়ী প্রতিবছর চাকরির বাজারে শিক্ষিত-নিরক্ষরসহ প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঢুকছে। এ বিপুল শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত। চাকরির বাজার থেকে সরকার একরকম হাত গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে বেসরকারি খাতে। কিন্তু আবাসন খাতের আনুষঙ্গিক ২৬৯টি খাতে গতি কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বরং ছাঁটাই চলছে।
কর্মসংস্থানে আবাসন ও সহযোগী শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) মহাসচিব মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন বলেন, আবাসন শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে ২৬৯টি উপ-শিল্প খাতের ১২ হাজার শিল্প প্রকল্পের অস্তিত্ব ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। এক কোটি ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান ও ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এই আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্রের কারণে ১৪টি বড় শিল্প খাতের মধ্যে আবাসন শিল্পের অবস্থান তৃতীয়। গৃহায়ণ ও নির্মাণশিল্পে বিনিয়োগ করা প্রতি এক টাকা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭৮ পয়সা হারে যোগ করে।
অনওয়ার্ড ডেভেলপারস লিমিটেডের মূল প্রতিষ্ঠান আরআর গ্রুপে বছর দুয়েক আগে ৮৫০ জন কর্মী কাজ করত। এখন সেখানে কর্মীর সংখ্যা নেমে এসেছে ৫৫০ জনে। ওই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ বাহার বলেন, ‘আমাদের গ্রুপের আরো বেশ কয়েকটি ব্যবসা আছে। তা দিয়েই আমরা টিকে আছি। নৌপরিবহন ব্যবসায় যে লাভ হয় তা দিয়ে আমাদের আবাসন কোম্পানির কর্মীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে।’
এম এ বাহার জানান, গত ঈদে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মীর বোনাস হয়নি। টাকা জোগাড় করতে না পেরে কর্মীদের চাকরির বয়স অনুযায়ী বোনাস দেওয়া হয়েছে। যার চাকরির বয়স বেশি সে কিছু টাকা পেয়েছে। যার চাকরির বয়স কম সে এক টাকাও পায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বড় আবাসন কোম্পানির মালিক বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে আগে প্রায় ২৫ জন প্রকৌশলী কাজ করতেন। এখন আছেন ১১ জন। তাদেরও বিশেষ কোনো কাজ নেই। কারণ, এখন কেবল একটি প্রকল্প চলছে। তিনি বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগেও প্রতিবছর আমরা বিজ্ঞাপন দিয়ে কর্মী নিয়োগ দিতাম। এ ছাড়া বিভিন্নজনের অনুরোধে অনেককে নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন চলছে ছাঁটাই।’
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার হাবিব কমপ্লেক্স নামের একটি আসবাবপত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক মজিবুর রহমান জানান, তার কারখানা ও শোরুম মিলিয়ে বছর দুয়েক আগে ২০০ কর্মী ছিল। এখন আছে মাত্র ৪০ জন। তিনি বলেন, ‘দোকানে কোনো বিক্রি নেই। ক্রেতা নেই। তাই বাড়তি লোক রেখে বেতন দিতে পারি না। এ কারণে বাধ্য হয়ে পুরনো কর্মীদের চাকরি থেকে বিদায় করতে হচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, আগে মাসে ১২-১৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো, এখন তা চার-পাঁচ লাখে নেমেছে।
গৃহ নির্মাণে গতি নেই বলে ভালো নেই ভবনের নকশাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। বনানীতে অবস্থিত একটি নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘গত বছরও আমরা ৩৫টি প্রকল্প পেয়েছিলাম। এ বছর এখন পর্যন্ত জুটেছে মাত্র ৯টি। কাজ কমে যাওয়ায় ১৫ জন স্থপতির মধ্যে তিনজনকে ইতোমধ্যে বিদায় দিতে হয়েছে। কোম্পানির কর্তৃপক্ষ মনে করছে ভবিষ্যতেও সময় ভালো যাবে না।’ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
