Skip to content

ক্রসফায়ার আতঙ্কে ‘নিরাপদে’ জামায়াত-শিবির

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় আতঙ্কে আছেন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা। সাম্প্রতিক সময়ে একজন ছাত্রদল ও জামায়াত নেতা ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের পরিবারের মধ্যেও চলছে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি। এই অবস্থায় লোকবল বাঁচাতে এবং মনোবল ধরে রাখতে কর্মীদের ‘নিরাপদে’ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি জোটের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচিতে গাড়িতে আগুন, বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির পক্ষ থেকেও সহিংসতা দমনে অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

গত সোমবার রাজধানীর মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে নড়াইল পৌর জামায়াতের নেতা ইমরুল কায়েস পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। প্রায় একই সময়ে খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনিও নিহত হয়েছেন ক্রসফায়ারে। যদিও দুই পরিবারের অভিযোগ, সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়।

আর এই ক্রসফায়ার ‘আতঙ্ক’ তৈরি হয়েছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলটির অনেক নেতাকর্মীই পরিবারে চাপে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসের মৃত্যুর পর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক হয়ে নিরাপদে থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। জামায়াত-শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী এমন তথ্য জানিয়েছেন বাংলামেইলকে।

শিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী প্রচার সম্পাদক জামাল উদ্দিন বাংলামেইলকে বলেন, ‘র‌্যাবের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজে শিবির সভাপতি মো. আসাদুল্লাহ তুহিন। গতকাল (সোমবার) আসাদুল্লাহ তুহিন মা-বাবার সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার সময় র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বাবা-মা জানিয়েছে তাদের সামনেই তার ওপর নির্যাতন করে র‌্যাব। পরে তাকে নিয়ে এসে সারা রাত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আরো ২ জনকে গ্রেপ্তার করে। রাতের কোনো এক সময় তাকে হত্যা করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেখে যায়। সকালে মেডিকেল থেকে ফোন করে তার মা-বাবাকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়।’

ঢাকা জেলা ছাত্র শিবিরের অভিযোগ, ধামরাইয়ের শরীফবাগ কামিল মাদরাসার ছাত্রাবাস থেকে শিবিরকর্মী মঞ্জুরুল মাওলাকে ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে। তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্র শিবির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন বাংলামেইলকে বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে যেখানে সারা দেশের মানুষ সোচ্চার সেখানে নিরীহ ছাত্রদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অথচ ইতিপূর্বে এসব ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে না পেরে নিরীহ শিবিরকর্মীদেরকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জানুয়ারি যুবলীগের নেতাকর্মীরা শিবিরের ৩ কর্মী শিহাব উদ্দিন, মাহমুদ, আবু সাইদকে মারধর করে পুলিশ দেয়। আহতের পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে ভর্তি করার পরও তাদের ওপর হামলা করা হয় বলে অভিযোগ। আর এই তিন শিবিরকর্মীর পরিবারের মধ্যে ক্রসফায়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে।

মো. শিহাব উদ্দিনের বাবা আব্দুল মোতালেব বাংলামেইলকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আমার ছেলেসহ তিনজনকে যুবলীগ কর্মীরা বিনা অপরাধে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে গাড়িতে আগুন দেয়ার মিথ্যা অভিযোগে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পুলিশ তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু পুলিশ আহত অবস্থায় রাত ৮টার দিকে তাদের ওপর আবার নির্যাতন করে। বারবার নির্যাতনে তাদের জীবন নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এমনিতেও বিনা অপরাধে আমাদের সন্তানদের পৈচাশিকভাবে নির্যাতন করেছে যুবলীগ কর্মীরা। তার ওপর পুলিশের এই নির্যাতনে তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গোষ্ঠীর প্ররোচনায় আমাদের সন্তানদের হত্যা করা হতে পারে।’

এছাড়াও সারাদেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। তাদেরকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও জামায়াত ও শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারাকর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

জামায়াতের এক কর্মী জানান, সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন আমাদের আন্দোলন একদিনের নয়। এই জালিম সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রাজপথে মোকাবেলা না করতে পেরে দ্বীনের দাওয়াতে দায়িত্বপালনকারী ভাইদের হত্যা করা হচ্ছে। নড়াইলের এক দ্বীনি ভাইকে সন্ত্রাসী বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আপনাদের ওপরও এ ধরনের বিপদ আসতে পারে। সেজন্য আপাতত আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকুন।

দেশের বিভিন্ন জেলার তৃণমূল কর্মীদের কাছে এমন বার্তা এসেছে বলে একাধিক জামায়াত-শিবিরের কর্মী বাংলামেইলকে জানিয়েছেন।

সোমবার এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকার গণআন্দোলন দমনে সংবিধান ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবৈধভাবে দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, গুম ও গণগ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লায় যুবলীগের সন্ত্রাসীরা বাসে আগুন দেয়ার মিথ্যা অভিযোগে তিনজন সাধারণ ছাত্রকে ধরে পুলিশের হাতে দিয়ে পুলিশের সঙ্গে মিলে তাদের বেদমভাবে মারপিট করেছে। ১৯ জানুয়ারি নড়াইলের নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার অ্যাডভোকেট ইমরুল কায়েসকে গুলি করে হত্যা করা হয়, ২০ জানুয়ারি সোমবার রাতে খিলগাঁওয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদককে গুলি করে হত্যা করা হয়, ২৪ জানুয়ারি রামপুরায় ২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কেউ গ্রেপ্তার হলেই তার পরিবার-আত্মীয়স্বজন ও দেশবাসী গুলি করে হত্যার আতঙ্কে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত থাকেন। সোমবার হরতালে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে সাভার পৌরসভা জামায়াতে ইসলামীর আমীর লুৎফর রহমানও রয়েছেন।’

জামায়াতে এক কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে বাংলামেইলকে বলেন, ‘আন্দোলন মোকাবেলা করতে না পেরে সরকার গ্রেপ্তার আর ক্রসফায়ারের মাধ্যমে তা দমাতে চাচ্ছে। কিন্তু হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। আমাদের কর্মীদের নিরাপদে থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মাঠে থাকবে জামায়াত। কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ার, জুলুম-নির্যাতন যতো বাড়ছে জনতার প্রতিরোধও ততোই বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে নেতাকর্মীদের তুলে নেয়া হলেও স্বীকার করছে না প্রশাসন। গত ১৫ জানুয়ারি রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতা আল-আমীন ও তার স্ত্রী বিউটি বেগম এবং তাদের প্রতিবেশী মৌসুমীকে তুলে নিয়ে যায়। আল-আমীনকে থানায় নিয়ে তাকে গুলি করে আহত করেছে এবং তার হাত ভেঙে দিয়েছে। দিনে দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যায়, পরে গুলবিদ্ধ লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে আন্দোলন দমনে হত্যার নকশা করা হয়েছে।’ বাংলামেইল২৪ডটকম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫