Skip to content

হরতাল-অবরোধে ঘেরা দুর্ভোগের বাংলাদেশ

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: অবরোধের ৪০ দিন পেরিয়েছে, এর মধ্যে চলেছে হরতালও। ইতোমধ্যে হরতালও হয়েছে ১৩ দিন আবার নতুন করে ডাকা হয়েছে ৭২ ঘণ্টা। গতকাল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ হরতাল পালনের আহ্বান জানান।

অবরোধ-হরতাল ও নাশকতায় বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিদিনই বাড়ছে জনদুর্ভোগ। পরিসংখ্যানে যোগ হচ্ছে লাশের সংখ্যা, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ। পরিবহন শ্রমিক থেকে বিভিন্ন পেশার দিনমজুরদের জীবনযাত্রা চরমভাবে সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। হরতালের প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও। রাতে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ রাখার
নির্দেশে পরিবহন খাতে বেকার হয়ে পড়েছে অর্ধেক শ্রমিক। বিঘ্ন ঘটছে যাতায়াতেও। পেট্রল বোমার আতঙ্ক ঠেলে সাধারণ মানুষ ট্রেনে যাতায়াতের দিকে ঝুঁকলেও সেখানেও নাশকতা দিন দিন বাড়ছে।
গত ৪০ দিনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত রেলে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে ১১টি। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ১২ ঘণ্টার ও বেশি। প্রতিদিনই প্রায় লাশের সংখ্যা বাড়ছে। এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৮৯ জন। এর মধ্যে পেট্রল বোমায় ৫২, ক্রসফায়ারে ২০, সংঘর্ষে ১৩ ও পুলিশের গুলিতে চারজন। পেট্রল বোমায় দগ্ধ ১৩৫ জনকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে। এখনও সেখানে চিকিৎসাধীন ৬২ জন। পেট্রল বোমায় নিহত সিংহভাগ বাসযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিক।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অবরোধ শুরুর পর থেকে ১ হাজার ৭০টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আগুনে পুড়ে ও ভাঙচুরের কবলে পড়ে। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের পরিবহন শ্রমিক সালাম জানান, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাতের বেলায় দু’দিন পরপর এক দিন কাজ পেতেন তিনি। কারণ বাস্তবে গাড়ি চালানো হয় অর্ধেক। এখন রাতে পরিবহন চালানো বন্ধ করতে নির্দেশ আসার পর থেকে পুরো বেকার তিনি। সালাম জানান, তার মতোই পরিবহন খাতে বেকার হয়ে পড়েছে অর্ধেকের বেশি শ্রমিক, যাদের সবারই দিনের আয়ে দিন চলে।
বরিশাল ট্রাক মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, প্রতিদিন প্রায় ৪শ’ ট্রাক চলাচল করলেও এখন বসে আছে ৩শ’ ট্রাক।
তিনি জানান, আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে ট্রাকের চালক-হেলপার। সে আতঙ্কে ট্রাক চালাতে চান না চালকরা। এখন তো বিপদ, শ্রমিকরা বাঁচবে কীভাবে, মালিকরাইবা ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে।
সিলেটে পাল্টে গেছে সড়কের দৃশ্যপট। দূরপাল্লার যান চলাচল নেমে এসেছে অর্ধেকেরও কমে। সিলেট জেলা সড়ক পরিবহনের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক বলেন, পুলিশের সঙ্গে বাসমালিকদের বৈঠক হয়েছে। সড়কে নাশকতা রাতের বেলাই বেশি হয়। তাই রাতে গাড়ি চালানো নিষেধ করা হয়েছে। আমরাও তা মেনে নিয়েছি। এখন দিনের বেলায় গাড়ি চলাচলে কিছু গতি আসছে। তবে পরিবহন খাতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে খুবই ক্ষতি হচ্ছে।
গতকাল চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ২শ’ বাস ছেড়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় চলত ১ হাজার ২শ’ থেকে ৩শ’ বাস। চট্টগ্রামের বাণিজ্য কেন্দ্র বলে পরিচিত খাতুনগঞ্জের ব্যবসার অবস্থা তেমন ভালো নয় বলে জানান সেখানকার ব্যবসায়ী নেতা জামাল হোসেন।
আইন-শৃক্সখলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা আইন-শৃক্সখলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নয়নের কথা বললেও তার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসছে না। জনমনে আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে।
দেশজুড়ে প্রায় মানুষের এখন একটিই প্রশ্ন, ‘এর সমাধান কবে।’ সহসা সমাধানের কোন পথ আছে এমন ইংগিতও মিলছে না। হরতালের কারণে প্রতি সপ্তাহের এসএসসি পরীক্ষা পেছাতে হচ্ছে। তারপরও অভিভাবরা উদ্বিগ্ন, শুক্রবার পরীক্ষা হলেও আতঙ্কে থাকেন তারা।
রাজধানীর কামাল আহমেদের মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে মিরপুরের বাঙলা স্কুল থেকে। তিনি বলেন, পরীক্ষা না হতে দেওয়া যদি টার্গেট হয় তা হলে তো শুক্রবারও তারা কেন্দ্রে হামলা করতে পারে-সেজন্য আতঙ্কে আছি। আতঙ্ক কেবল সেখানেই নয়, রাজধানীতে গ্রেফতার আতঙ্কও আছে। রাজধানীতে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ১০৭৮ জন। মামলা হয়েছে ১ হাজারেরও বেশি।
গ্রেফতার নিয়ে পুলিশি বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আতঙ্ক আছে সব পক্ষেই। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে প্রতিদিন দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) তথ্য মতে, হরতাল-অবরোধে প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ২৭৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তবে প্রতিদিন শিল্প উৎপাদন সক্ষমতায় ২৫ শতাংশ ক্ষতি ধরলে এর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি।
তৈরি পোশাক রফতানিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। বিজিএমইএ’র তথ্য মতে, এক দিনের অবরোধ বা হরতালে ৬৯৫ কোটি টাকার পোশাক রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান খাত কৃষি খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা। পোল্ট্রি শিল্পে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। হিমায়িত খাদ্য খাতে প্রতিদিনের ক্ষতি প্রায় ৮ কোটি টাকা। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। চলমান অস্থিরতার কারণে এই খাতে প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত ও রফতানি খাতে প্রতিদিনের ক্ষতি ১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এভাবে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই হরতাল-অবরোধের ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠছে। কেবল ঢাকাতেই নয়, অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে গ্রামেও-বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে কৃষক। ভরা মৌসুমেও রাজশাহীতে ২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি জানান, চাষিরা তো বটেই, হরতাল-অবরোধে ব্যবসায়ীরাও অসহায়। পণ্য পরিবহন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বিপদে আছে। পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদেরই এর জের বহন করতে হচ্ছে। তবে আগের চেয়ে উন্নতি হচ্ছে। প্রশাসন সাহায্য করায় পরিবহনে অনেকটা আস্থা বেড়েছে। প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে হরতাল-অবরোধে কাঁচামাল বিক্রি অনেকটা কমে গেছ।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫