Skip to content

বুয়েটে জঙ্গিবাদ নিয়ে শিক্ষকদের দু’পক্ষ মুখোমুখি

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: শিক্ষকদের রাজনীতির সুযোগ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনা ও জঙ্গিবাদী রাজনীতির সঙ্গে দেশের বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষকদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কারও কারও তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে শাস্তির শিকার হয়েছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আড়ালে থেকে যাচ্ছেন ওই শিক্ষকরা। এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

জামায়াত নেতা যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তার সমালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে মন্তব্য করেন, ‘জয় ইন্ডিয়া, জয় মাসল পাওয়ার, জয় নেসটি পলিটিকস, জয় ইনজাস্টিস (ভারত, পেশিশক্তি, কদর্য রাজনীতি ও অবিচারের জয়)।’ এ মন্তব্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইতে ১২ এপ্রিল ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জাহাঙ্গীর আলমের কক্ষে গেলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। লাঞ্ছিত হন ওই শিক্ষক। এ ঘটনায় দায়ী ছাত্রদের শাস্তির দাবিতে কর্মবিরতি পালন করে শিক্ষক সমিতি; যার পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। এ ছাড়া আরো দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়; যদিও পরে উচ্চ আদালত এই শাস্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। শিক্ষক সমিতি ছাত্রদের শাস্তির দাবিতে কর্মবিরতি পালন এবং বুয়েট অচল করে দেওয়ার হুমকি দিলেও ওই শিক্ষকের রাজনৈতিক মন্তব্য সম্পর্কে নীরবতা পালন করে। স্মরণযোগ্য যে বুয়েট অর্ডিন্যান্স অনুসারে শিক্ষকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই।

এর আগে ২০১৩ সালে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি ও কটূক্তি করেন বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক হাফিজুর রহমান রানা। এ কারণে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন মহানগর দায়রা জজ আদালত। হাফিজুর লেখেন, ‘হায়েনা, ওই হায়েনা তুই দেশকে খেয়েছিস, এখন বুয়েটকে খাবি…পারবি না। আমরা বুয়েটের শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলাম শিকারি। প্রথমে তোর মাথায় গুলি করব, পরে পেটে। তারপর মাথা কেটে বুয়েটের সামনে টানিয়ে রাখব। যাতে আর কোনো হায়েনার আক্রমণে বুয়েট আক্রান্ত না হয়।’

অতি সম্প্রতি জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির করার অভিযোগে বুয়েটের ছাত্র তানজিলুর রহমান লাবিবকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। হেলালী নামের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।

এদিকে শিক্ষক লাঞ্ছনার দায়ে ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমকে ছুটি দেওয়া ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১১ মে বুয়েটে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ অভিযোগ করেন, বুয়েট জঙ্গিদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, বুয়েটকে জঙ্গি ও রাজাকারমুক্ত করতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ ১৬ কোটি মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলে। তাই এ দাবি হচ্ছে গণমানুষের। ছাত্রলীগের সভাপতি বলেন, ‘আমরা চাই না এ ইস্যুতে বুয়েট এক দিনের জন্য বন্ধ হোক। যদি হয়, তাহলে এর দায়দায়িত্ব বুয়েট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে। ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষ সরাসরি জঙ্গিবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে নিজেদের পরিচিত করে তুলেছে।’ আরেক সমাবেশে সোহাগ বলেন, ‘এক ধরনের মানসিকতার পাষণ্ড শিক্ষকদের কাছে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জিম্মি। তাদের জন্যই বুয়েট একসময় ছয় মাস বন্ধ ছিল। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জামায়াতি শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

বুয়েটের ওই সমাবেশে স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত বলে কয়েকজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে ওই সব শিক্ষককে বাদ দেওয়া না হলে আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়। যেসব শিক্ষকের নামে অভিযোগ করা হয় তারা হলেন ড. জাহাঙ্গীর আলম, ড. আতাউর রহমান, ড. বদরুজ্জামান, ড. মাহবুবুর রাজ্জাক, ড. এ কে এম মাসুদ প্রমুখ।

তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় আর্থিক সহায়তাদানেরও অভিযোগ করা হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারকে হেয় করার জন্য বুয়েটের প্রোভিসিবিরোধী আন্দোলনে তাঁরা নেতৃত্ব দিলেও এখনো তাঁরা বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ফসল হিসেবে রেজিস্ট্রার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. এ কে এম মাসুদের দুই বছরের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও এখনো তিনি ওই দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানানো হয়।

জঙ্গিবাদী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. আতাউর রহমান বলেন, ‘আমি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে ঘৃণা করি। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সোচ্চার ভূমিকা পালনের কারণে আমার এবং আরো দু-একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে। জঙ্গিবাদী তৎপতার সঙ্গে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক জড়িয়ে পড়া কাম্য হতে পারে না।’ তবে এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানান তিনি। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, জামায়াতের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী দুই-চারজন শিক্ষক থাকতে পারেন। তবে তা প্রমাণ করা কঠিন।

বুয়েটের কতিপয় শিক্ষকের জঙ্গি ও জামায়াত সম্পৃক্ততা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক প্রোভিসি হাবিবুর রহমান বলেন, যদি তাঁদের সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে নাম আসবে কেন? তাঁদের সম্পর্কে সবাই জানে।

বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ কনক বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও বহিষ্কার করা না হলে বুয়েটে তাঁদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে। চলমান পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এ লক্ষ্যে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য বুয়েটের উপাচার্য খালেদা ইকরামকে গতকাল টেলিফোন করা হলে তিনি প্রথমে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর বিশেষ অনুরোধে দুটি বিষয়ে কথা বলেন। যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার শাস্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী তৎরতার সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনে অনেকেই অনেক কথা বলে, আমাদের কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না।’

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫