Skip to content

শীতের সবজির লাভ মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥

রাজধানী ঢাকার যেকোনো বাজারে শীতের টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা প্রতি কেজি। অথচ ফসলের মাঠে এই টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে। অর্থাৎ ফসলের মাঠ থেকে খুচরা পর্যায়ে বিক্রিতে শুধু কেজিতেই পার্থক্য প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ঢাকার পাশে সাভারের ধামরাইর নয়ারহাট পাইকারি সবজির বাজারে ফুলকপি আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে প্রতিশ’ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এতে একটি কপির মূল্য পড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা মাত্র। অথচ ঢাকার বাজারে সেই ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে খুচরা ১৮ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে। তা হলে প্রশ্ন ওঠে মাঝখানে কারা ফায়দা লুটছে? শীতের প্রতিটি সবজিতেই এভাবে মূল্যে ঠকছেন ক্রেতারা। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছে লাভের পুরো অর্থ। যুগান্তর প্রতিনিধিরা সরেজমিন বিভিন্ন বাজার ঘুরে তুলে এনেছেন এ চিত্র।
শীতের সবজি ঘিরে সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগীরাও। বগুড়া, চট্টগ্রাম, সাভারসহ ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজির মূল্যে দেখা গেছে বিরাট ব্যবধান। অথচ কৃষক মূল্য পাচ্ছে খুবই কম। এই রিপোর্ট তৈরিতে সার্বিক সহায়তা করেছেন বগুড়া ব্যুরো প্রধান মো. নাজমুল হুদা নাসিম, চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে লোকমান চৌধুরী, ধামরাই প্রতিনিধি শাহীন খান ও ঢাকা থেকে প্রদায়ক মাহমুদুল হাসান, ইয়াসিন রহমান ও বাহাউদ্দিন।
বগুড়া : ঢাকায় এক কেজি বেগুন ৫০ টাকা হলেও বগুড়ার বাজারে ১০ টাকায় তা বিক্রি হচ্ছে। ওই বাজারে ১৫ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ওই শিম ঢাকা এসে ৪০ টাকা হচ্ছে। বগুড়ায় শীতের অন্যান্য সবজির দাম কম থাকলেও ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি।
সরেজমিন দেখা গেছে, মহাস্থানের করতোয়া, বাঙালি ও নাগর নদী বিধৌত মহাস্থান, গোকুল, তেলিহারা, লাহিড়ীপাড়া, পীরগাছাসহ আশপাশের শতাধিক গ্রামের সবজি চাষ হয়েছে।
জানা গেছে, এই হাটে প্রতি মণ (৪০ কেজি) কপি ৭০০, মুলা ৩০০, বেগুন ৪০০, শিম ৬০০, গাজর এক হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাটের সবজি শহরের আড়তে মণপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীরা ক্রেতা পর্যায়ে আরেকটু বেশি নিচ্ছেন। বগুড়া শহরের রাজাবাজারে পাইকারি সবজি বিক্রেতা দয়াল ভাণ্ডারের মালিক আবদুর রহমান রুনু জানান, কৃষকরা ভালো মূল্য পাচ্ছেন। পাইকারি প্রতি মণ কপি ৮০০ টাকা, মুলা ৪০০ টাকা, বেগুন ৬০০ টাকা, শিম ৮০০ টাকা, গাজর এক হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
চট্টগ্রাম : এদিকে চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে শীতের সবজির সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে গত সপ্তাহের তুলনায় দাম কিছুটা কমেছে। নগরীর কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিতকরলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা- যা গত সপ্তাহে ছিল ৬৫-৮০ টাকা, টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়- যা গত সপ্তাহে ছিল ৮০-১০০ টাকা, ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে কেজি ৪০ টাকায়- যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০ টাকা, বরবটি কেজি ৪০-৫০ টাকা- যা গত সপ্তাহে ছিল ৫৫-৬০ টাকা, শিম প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ৬০-৭০ টাকা। এছাড়া লাউ বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়, বাঁধাকপি ৩০ টাকা, ঢেঁড়স কেজি ৫০-৬০ টাকা, শসা কেজি ৩০-৩৫ টাকা, ঝিঙ্গা ৪০-৫০ টাকা, পটল কেজি ৩০-৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৩০-৪০ টাকা, পেঁপে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০ টাকা, মূলা ২৫ থেকে ৩০ টাকায়, কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০-৮০ টাকায়।
সাভার : শীতের সবজিতে বগুড়ার কৃষকরা লাভবান হলেও মূল্য নিয়ে চরম হতাশায় পড়েছেন সাভারের কৃষকরা। তাদের মতে জমিতে আশানুরূপ ফসল ফলিয়েও উঠছে না উৎপাদন খরচ, মিলছে না দাম। দিনে দিনে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে পণ্যের নায্যমূল্য না পেয়ে লাখ লাখ কৃষকের চোখে মুখে হতাশা। সরেজমিন ধামরাইয়ের বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রেতারা খুচরা বাজারে আগুন দামে সবজি কিনলেও খুবই কম দামে তা বিক্রি করছেন কৃষকরা। ধামরাইয়ের নয়ারহাট, ধামরাই, কালামপুর, ইসলামপুরের সবজি বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা তাদের সবজি যে দামে বিক্রি করছেন তা রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার থেকে অনেক কম।
সারের দাম, সেচ প্রকল্পের বিদ্যুতের আগুনছোঁয়া দাম, জ্বালানি তেল, কৃষি শ্রমিকদের মজুরি ও চাষাবাদ খরচের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কিছুর দাম বেড়েছে। ফলে ফসলের নায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদন ধরে রাখতে পারছেন না। ধামরাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ধামরাই এলাকায় চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হচ্ছে। যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ধামরাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, রেকর্ড পরিমাণ জমিতে শীতের সবজি চাষ করে এবং বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের স্বস্তি নেই।
পাইকারি বাজার : এদিকে কৃষক কম মূল্য পেলেও ঢাকার পাইকারি বাজারে চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে শীতের সবজি। ইতিমধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতকালীন নানা শাক-সবজি। ঢাকার পাইকারি বাজার ঘুরে জানা গেছে, নতুন আলুর দাম একটু বেশি হলেও অন্যান্য সবজির দাম গত সপ্তাহ থেকে অনেকটাই কম। তবে খোঁজ নিয়ে জানা, গেছে কৃষক পর্যায় থেকে যে দামে সবজি কেনা হয়েছে তার থেকে তুলনামূলক বেশি দাম দেখা গেছে পাইকারি বজারে।
রাজধানীর পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি নতুন গোল আলু পাইকারি ৮০-৯০ টাকা, পুরান আলু পাইকারি ২৮ থেকে ৩০ টাকা, লাল আলু ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। বেগুন ৪০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে- যা গত সপ্তাহে পাইকারি দর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, কাঁচামরিচ ৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে পাইকারি দর ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ফুলকফি ১১-১৪ টাকা ও বাঁধাকফি ১৫-১৬ টাকা পাইকাীিদরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া টমেটোর দাম একটু কমলেও তুলনামূলক বেশি। লাল টমেটো পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায় আর সাদা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা পাইকারি দরে- যা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ ও ১৫০ টাকা দরে। করলা পাল্লা (৫ কেজি) পাইকারি কিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা দরে। এ ছাড়াও জলপাই ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, ধুন্দল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, বরবটি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, কচু ২৮ থেকে ৩৩ টাকা, কচুর লতি ৩২ থেকে ৩৮ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও বাজারে বিভিন্ন ধরনের শাকের দামও কমেছে। এদিকে বাজারে দাম কমেছে করলা, ঝিঙা, পটল, শসা, কাকরল, পেঁপে, গাজর ইত্যাদি সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে।
খুচরা বাজার : এদিকে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিটি সবজির মূল্য দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর হাতিরপুল বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন আলু মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, যা গত সপ্তায় বিক্রি করতে দেখা গেছে ১০০-১২০ টাকায়। আর কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়, যা গত সপ্তায় বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়। একই পণ্য পাইকারি বাজারে যথাক্রমে ৬৫ ও ৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ১০০-১২০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০ টাকায়। সেখানেও কাঁচা মরিচের পাইকারি বাজারের দামের তুলনায় খুচরা বাজারে ২০ টাকা বেশিতে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
একই বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী সামিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করি না, পাইকারি বাজার চড়া থাকলে আমাদের বেশি দামে ক্রয় করতে হয়। যে কারণে বিক্রিও করতে হয় একটু বেশি দামে। তিনি বলেন, ‘পরিবহন খরচ বেশি থাকায় আমাদের বেশি বিক্রি করতে হচ্ছে।’ তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবহন খরচ নয় দাম বাড়ার মূলে রয়েছে খুচরা ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার প্রলোভন।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫