বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন (প্রকৃত নাম নয়) এক বছরের মাথায় আবারও দ্বিতীয়বারের মত বাবা হতে যাচ্ছেন। প্রথমবার বাবা হওয়ার সংবাদে যে আনন্দ ছিলো তার চোখে-মুখে, তার বদলে এবারের খবরটি যেন তাকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে ডাক্তার দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার জন্য ন্যূনতম তিনবছর ব্যবধান রাখতে বললেও এর মধ্যেই তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন।একদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকা স্ত্রীর গর্ভবতী হয়ে পড়া; অন্যদিকে দ্বিতীয় সন্তানের খরচ ও লালন-পালনের চিন্তা, সব মিলে ঘোর অমানিশায় পড়েছেন যেন সাখাওয়াত দম্পতি।
ডাক্তারের পরামর্শ যে সাখাওয়াত মানেননি তাও নয়। স্ত্রীর থাইরয়েডে সমস্যা (হরমোনজনিত রোগ) থাকায় জন্মবিরতিকরণ ট্যাবলেট না খাইয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে সাখাওয়াত নিজেই কনডম ব্যবহার করতেন। সঠিক পদ্ধতি মেনে কনডম ব্যবহার করেও একদিন ঘটে যায় বিপত্তি। মিলনের সময় ছিড়ে যায় তার কনডম। অনাকাঙ্খিত এ পরিস্থিতির কারণে প্রথম সন্তান হওয়ার সাতমাসেই গর্ভবতী হয়ে পড়েন তার স্ত্রী।
সাখাওয়াত বাংলানিউজকে বলেন, ‘এসএমসি’র (সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি) ৭০ টাকা দামের ‘এক্সট্রিম’ ব্যবহার করতাম। এটাতে এলার্জির সমস্যা হওয়ায় পরে ‘ইউ অ্যান্ড মি’ কনডম ব্যবহার শুরু করি। সঠিক নিয়ম মেনেই আমি কনডম ব্যবহার শুরু করলেও হঠাৎ মিলনের সময় কনডম ছিড়ে যায়। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। অনিচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর গর্ভে চলে আসে সন্তান।’ (সাখাওয়াতের বক্তব্য বাংলানিউজকের কাছে ধারণ করা আছে)
সাখাওয়াতের মতো এমন পরিস্থিতি হয়েছে ফেনী পরশুরামের বাসিন্দা দুই সন্তানের পিতা মেজবাহ উদ্দিনেরও (মূল নাম আরেকটি)। মিলনের সময় কনডম ছিড়ে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়ে তার স্ত্রী। তবে মেজবাহ এর স্ত্রীর ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। স্ত্রীর ডায়াবেটিস থাকায় এ সন্তানকে তো বাঁচানো যায়নি তার স্ত্রীও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে কোনো রকমে বেঁচে উঠেছেন।
মেজবাহ বাংলানিউজকে বলেন, ‘স্ত্রীর ডায়াবেটিস থাকায় ডাক্তার তাকে জন্মবিরতিকরণ ট্যাবলেটের বদলে আমাকে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। সে অনুযায়ী কনডম ব্যবহার করি। আগে প্যানথার ব্যবহার করতাম। একদিন এটা মিলনের সময় ফুটো হয়ে গেলেও সে যাত্রা থেকে বেঁচেছিলাম। এরপর স্যানসেশন ব্যবহার করি…।’
তিনি বলেন, ‘সঠিক পদ্ধতিতেই আমি কনডম ব্যবহার করি। যেমন মিলনের সময় যেন ভেতরে বাতাস না প্রবেশ করে সে ব্যাপারে বরাবরই সতর্ক থাকি। একরাতে এমন সতর্ক থাকা অবস্থাতেও বিপত্তি ঘটে যায়। দ্বিতীয়বারের এমন বিপত্তি, দুর্ঘটনা নিয়ে এসেছে আমাদের জীবনে।’
এসএমসি’র এসব কনডমকে নিম্নমানের কনডম বলে তিনি মন্তব্য করেন। (মেজবাহের বক্তব্যও বাংলানিউজের কাছে ধারণ করা আছে।)
সাখাওয়াত ও মেসবাহ-এর দুটি কেস স্টাডি নিয়ে কথা হয় এসব কনডমের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সোশাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড এর সঙ্গে। এসব ঘটনার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকিশন অফিসার সালমা আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, ‘সঠিক পদ্ধতি মেনে কনডম ব্যবহার করলে এ অবস্থা হওয়ার কথা নয়। সম্ভবত কনডমের ভেতর বাতাস প্রবেশ করেছিলো তাই মিলনের সময় তা ছিড়ে গেছে।’
এসএমসি’র কনডম থেকে এলার্জি ও ইনফেকশন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করেননি। এসএমসি নিম্নমানের কনডম তৈরি করে না বলে তার দাবি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে এমএমসির কনডমের বিরুদ্ধে ক্রেতাদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ থাকলেও যৌন বিষয়ক সমস্যা হওয়ায় এ বিষয়ে অভিযোগকারীরা প্রকাশ্যে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
চিকিৎসকরা জানান, ভালো মানের কনডম ব্যবহার করলে বিভিন্ন যৌন সংক্রমণ ব্যাধি যেমন এইডস, সিফিলিস এবং গনোরিয়ার হাত থেকে যেমন বাঁচা যায়। তেমনি নিম্নমানের কনডম ব্যবহারে নিজের এবং যৌনসঙ্গীরও হার্পিস ভাইরাস (এক ধরণের চর্মরোগ) সংক্রমণ হতে পারে।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও মেরি স্টোপস এর শাখাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনিচ্ছাকৃত যেসব গর্ভধারণ হচ্ছে তার একটি অংশ নিম্নমানের কনডম ফেটে যাওয়ার কারণে ঘটছে।। এর সংখ্যা ঠিক কত তার যথার্থ পরিসংখ্যান নেই। কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া যায় তা হচ্ছে-অপরিকল্পিত গর্ভধারণের প্রায় ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে কনডম ছিড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক চিকিৎসক ও গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. নাজনীন আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, কনডম ফেটে যাওয়ার মতো এরকম পরিস্থিতির খেসারত টানতে হয় নারীদের। কনডমের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় এবং নিম্নমানের হওয়ায় অনেক নারীকে বড় ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সদস্যরা জানান, কনডম ফেটে ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি’ ক্রমাগত বাড়ছে। এ কারণে দুর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন নারীরা।
কয়েকজন ফার্মেসি মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রতিনিয়ত এসএমসি এর এক্সট্রিম, ইউ অ্যান্ড মি, স্যানসেশন ও প্যানথারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পান। কনডম ফেটে যাওয়াসহ এলার্জিও ইনফেকশনের অভিযোগও তারা পেয়েছেন। এসব অভিযোগ এসএমসি-এর কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন বলেও তারা জানান।
এসএমসি’র ‘এক্সট্রিম’ কনডম ব্যবহার করে অ্যালার্জি থেকে ইনফেকশনের হয়েছে রাজধানীর ওয়ারীর এক বাসিন্দার। সে ইনফেকশনটি শেষ পর্য্যন্ত তার স্ত্রীর শরীরেও ছড়িয়েছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘ওটা ব্যবহারের পর চুলকাতো। জায়গাটি এমনিতেই স্পর্শকাতর। একপর্যায়ে চুলকানি থেকে ইনফেকশন হয়। পরে ডাক্তার জানিয়েছেন, কনডমে থাকা ল্যাটেক্স (একধরনের রাবার) থেকে এলার্জি হয়ে ইনফেকশন হয়েছে।’
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এসএমসি’র কনডম আন্তর্জাতিক মানের নয়। এসব কনডমে গুণগত মান ঠিক নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার যখন কনডম রপ্তানির কথা চিন্তা ভাবনা করছে তখন নিজ দেশের কনডমের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এসএমসি’র কনডম ব্যবহার করে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা বিএসটিআইসহ বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়ে নিয়মিত এসব কনডম পরীক্ষা করার দাবি জানান।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এসএমসি-এর এক্সট্রিম (ঢঞজগঊ) এক প্যাকেটের দাম ৭০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কনডমে রয়েছে ৩টি করে প্যাকেট। এ প্রতিষ্ঠানের ‘ইউ অ্যান্ড মি’ এর দাম ৩০ টাকা, স্যানসেশন-এর দাম ২০ টাকা এবং প্যানথারের দাম ১২ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসএমসি ব্যান্ডের কনডমগুলো ল্যাটেক্স নামক একধরনের রাবার দিয়ে তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মান সম্মত কনডমে ল্যাটেক্স ব্যবহার হলেও তা উচ্চমান সম্পন্ন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের এসএমসি’র কনডমে সেসব গুণগত মান বজায় রাখা হয় না।
জানা যায়, এই ল্যাটেক্স রাবার গাছ থেকে পাওয়া যায়। দ্য আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অ্যালার্জি, অ্যাজমা অ্যান্ড ইমিউনোলজি জানিয়েছে, বেশ কিছু মানুষের ল্যাটেক্সে উপস্থিত প্রোটিনের থেকে এলার্জি হতে পারে। ল্যাটেক্স এলার্জি হলে হাঁচিূ নাক দিয়ে জল পড়াূ চুলকানিূ মাথা ধরাূ মাথা ঘোরা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অ্যানাফিলাক্সিজ হতে পারে যার ফলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যাদের ল্যাটেক্স এলার্জির সমস্যা আছে তাদের সিন্থেটিক কনডম ব্যবহার করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তবে এসএমসি’র কোনো কনডম সিন্থেটিক নয়। সবই ল্যাটেক্স থেকে তৈরি। বিদেশি অনেক কনডম ল্যাটেক্সের হলেও তার গুণগত মান বজায় রেখে তৈরি করা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট বলছে, নিম্নমানের কনডম থেকে মহিলারা ক্যান্সারে পর্য্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নিম্নমানের এসব কনডমের বিষয়ে চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘সাবধান!’ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
