আফসান চৌধুরী ॥
সিলেটে জঙ্গি বিরোধী অভিযান নিয়ে ৫টি প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে একটি সফল অভিযানের পরও এ নিয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। আতিয়া মহলে জঙ্গি বিরোধী অভিযান শেষ, জঙ্গিদের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু ৫ দিনের ওই অভিযানে সেনাবাহিনী সহ অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এটা ভাল যে জঙ্গি তৎপরতা বা এর বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে, তারা বিভিন্ন তথ্য জানতে চাচ্ছে। এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ও অনিবার্য। এজন্যে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুহল বা জঙ্গি সম্পর্কে কোনো তথ্য বা প্রশ্ন থাকলে তার সদুত্তর দেওয়া।
সিলেটে জঙ্গি বিরোধী অভিযান নিয়ে ৫টি প্রশ্ন হচ্ছে:
১. হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি বিরোধী অভিযান কয়েক ঘন্টার হলেও সিলেটে জঙ্গি বিরোধী অভিযান শেষ হতে কেন ৫ দিন লেগে গেল? এর আগে এধরনের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে র্যাব ও পুলিশ অংশ নিলে সিলেটে কেন সেনাবাহিনী এ অভিযানে অংশ নিল?
২. এটা কি গোয়েন্দাদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা প্রমাণ করছে যে ধারাবাহিকভাবে গত কয়েক সপ্তাহে জঙ্গি তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা সারাদেশে ব্যাপক পরিকল্পনার অংশ বলেই মনে হচ্ছে?
৩. জঙ্গিদের মৃত্যুর চাইতে তাদের জীবিত গ্রেফতার কি ভাল নয়, তাহলে তাদের পরিকল্পনা ও কারা জড়িত সে সম্পর্কে পুলিশ আরো বেশি তথ্য পেতে পারত?
৪. এটা কি সত্য যে রাজনৈতিক কোনো সমস্যা থেকে দৃষ্টিপাত অন্যত্র সরাতে কিংবা ভারতের সঙ্গে অজনপ্রিয় চুক্তিগুলো করতে জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে যাচ্ছেন।
৫. কি ধরনের তথ্য-ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত যাতে সাধারণ মানুষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে তাদের প্রশ্নের সদুত্তর পেয়ে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে এবং তারা আরো তথ্য জানার সুযোগ পেতে পারে।
সাধারণ মানুষ যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় আস্থা ফিরে না পায় তাহলে বরং আরো ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে যা আদৌ ভাল হতে পারে না।
এছাড়া বর্তমানে জঙ্গি নিয়ে আগ্রহ ও উদ্বেগ মানুষের মধ্যে এখন অনেক কম যা এক বছর আগে তাদের মধ্যে অনেক বেশি ছিল। ফেসবুকে নতুন নতুন জঙ্গি তৎপরতার খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অদক্ষ ও বিপজ্জনক কম মনে হওয়ায় মানুষের উদ্বেগ হ্রাপ পাচ্ছে।
হলি আর্টজানের জঙ্গি অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার করেছিল সে তুলনায় বর্তমান জঙ্গি তৎপরতা অতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না। বিষয়টি জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে মানুষের মধ্যে উপেক্ষার জন্ম দিচ্ছে। কেউ কেউ চিন্তা করছেন হালে জঙ্গি তৎপরতা মনে হয় নিম্ন মানের বরং প্রশ্নবোধক জঙ্গি তৎপরতা মনে হচ্ছে। মানুষের মধ্যে জঙ্গি নিয়ে সর্বজনীন তথ্যপ্রবাহ ও শিক্ষা প্রচারণা প্রয়োজন। যাতে তাদের মনে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণের সৃষ্টি হয়েছে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করতে পারে। এটা সুস্পষ্ট যে মানুষের মধ্যে জঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ হ্রাস পাচ্ছে। জঙ্গি বিরোধী অভিযানের সফলতা এ নিয়ে মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তার অবসান ঘটাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে ধারাবাহিক জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা এবং সারাদেশে তাদের কার্যক্রম বা উপ¯ি’তি যাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্যে পর্যাপ্ত তথ্য প্রয়োজন এবং বিদ্যমান এ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। জঙ্গি সম্পর্কে সঠিক তথ্য বরং মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আস্থার সৃষ্টি করবে।
ধারাবাহিকভাবে ক্রসফায়ার চলে আসায় মানুষের কাছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে সঠিক উপলব্ধি অনুধাবন করা কষ্টকর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের রুটিন হিসেবে যা বলে আসছে তা তারা গ্রহণ করতে পারছে না। বরং তাদের তথ্য সম্পর্কে বিশ্বাস করাা কঠিন হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কোনো তথ্য নিজেরা তৈরি করে থাকে তাহলে তার বিশ্বাসযোগ্যতায় ফাঁক থেকে যায়। সফল একটি অভিযানের জন্যেও যদি তা করা হয় তাহলেও এতে ঘাটতি থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গি অভিযানের পর এমন এক তথ্য প্রবাহের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন যা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকবে। বর্তমান সময়ে তথ্য, ক্রিয়া ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া যখন সীমাহীন তখন তথ্যের অবারিত প্রবাহ থাকাই স্বাভাবিক। এবং তা না হলে মানুষের মধ্যে পুরো অভিযান নিয়ে এক ধরনের অবিশ্বাসের জন্ম নেয়। এজন্যে মানুষের মঙ্গে জঙ্গি তৎপরতা ও এর বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে শিক্ষামূলক প্রচারিভিযান প্রয়োজন। এতে যখনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি বিরোধী অভিযান শুরু করবে সে সম্পর্কে পরিস্কার এক ধারণা থাকায় এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে না।
লেখক সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক। ঢাকা ট্রিবিউন থেকে অনুবাদ
