মো. সহিদুল ইসলাম ॥
দ্রুত সতেজ হতে আমরা কতকিছুই না খাই। তবে বর্তমানে দ্রুত সজীব ও প্রাণবন্ত হতে এবং তৃষ্ণা নিবারণ করতে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেছে নেই সহজলভ্য কিছু পানীয়কে। তা হলোÑবায়ুযুক্ত কোলা ও চিনিযুক্ত বিভিন্ন কোমল পানীয়। সন্দেহ নেই যে, এই সকল পানীয় খুবই সুস্বাদু এবং দ্রুত সতেজকারক। তবে প্রচ্ছদ দেখে যেমন কখনো পুরো বইকে বিচার করা যায় না, তেমনি আপাত চোখে যা ভালো লাগে তাকেই উত্তম বলে সাব্যস্ত করাও ভুল। তাছাড়া এই সকল কোমল পানীয়তে থাকে অনেক ক্ষতিকারক পদার্থ, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পথকে সুগম করে।
প্রথমত, এটা শরীরে অতি মাত্রায় সুগারের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এছাড়া এতে আছে বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক সমৃদ্ধ প্রিজারভেটিভ ও কৃত্রিম সংমিশ্রণ। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের কোমল পানীয় আশঙ্কাজনক-ভাবে আমাদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে থাকে। তৃতীয়ত, কীটনাশক ব্যবহার এবং কোমলপানীয় গ্রহণের অতীত অভ্যাস পর্যালোচনা থেকে আমরা আরো কিছু শঙ্কা জাগানো তথ্য জানতে পারি। তা হলোÑপ্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় কিছু কিছু দিক থেকে বা”চদের জন্য কোমল পানীয় গ্রহণ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। যেসব বাচ্চা অধিক পরিমাণে প্রতিদিন মিষ্টি জাতীয় সোডা ও কোমল পানীয় গ্রহণ করে, ভবিষ্যতে তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকাংশেই।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপ্রতি পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যারা কম পরিমাণে শাক-সবজি খায় এবং অধিক পরিমাণে মিষ্টি পানীয় ও কোমল পানীয় গ্রহণ করে, তাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় বহুলাংশেই। যদিও ইতোমধ্যে সবুজ শাক-সবজি ও তরতাজা ফলমূল গ্রহণের ব্যাপারে অজ¯্র নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রচারাভিযান চলছে, তথাপি ঘরে ঘরে এখনো জাঙ্কফুড এবং গ্যাসযুক্ত পানীয় গ্রহণের হিড়িক কোনো অংশেই কমেনি।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি শনাক্তকরণে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য এই গবেষণায় কোমল পানীয় গ্রহণকারী ও বর্জনকারী উভয় ধরনের কিশোরী ও তরুণীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে গবেষণাটির ফলাফল প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয় ‘ক্যান্সার এপিডেমিওলজি, বাইওমারকারস অ্যান্ড প্রিভেনশন’ নামক সাময়ীকিতে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক কারিন মিচেল্স বলেন, আমাদের পরিচালিত গবেষণায় স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের ব্যাপারে অভিনব ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। তা হলোÑশিশুকালে, ঋতু¯্রাব হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে তথা বয়ঃসন্ধিকালীন যদি কোনো মেয়ে প্রতিনিয়ত কোমল পানীয় গ্রহণ করে, তবে তরুণী অবস্থায় তার স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অতি মাত্রায় প্রবল। আর তরুণী অবস্থায়ও যদি কেউ কোমল পানীয়কে অন্যতম খাদ্যাভ্যাসে পরিণত করে, তবে সেও এই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এই কারণে তিনি শিকার হবেন দীর্ঘস্থায়ী কোনো প্রদাহের।
মিচেল আরো বলেন, কম পরিমাণে শাক-সবজি গ্রহণ, অধিক হারে চিনি দিয়ে তৈরি মিষ্টিজাতীয় খাবার ও কোমল পানীয় গ্রহণ, সর্বোপরি লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং মার্জারিন বা কৃত্রিম মাখন গ্রহণের সাথে রক্তে উচ্চমাত্রায় প্রদাহ বৃদ্ধির একটি গভীর যোগসূত্র আছে। তিনি আরো বলেন, নিশ্চয়ই মহিলারা একদিনে কখনো স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন না। অবশ্যই এজন্য তাদেরকে অতিক্রম করে আসতে হয় কয়েকটি স্তর এবং দীর্ঘ সময়।
গবেষণাটির জন্য মিচেল এবং তার সহকারীরা ৪৫ হাজার দুশ চারজন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেন। উল্লেখ্য, গবেষণাটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয় এবং প্রতি চার বছর অন্তর-অন্তর অংশগ্রহণকারীদের নিকট থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। শেষ ধাপ সম্পন্নকালীন সময়ে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৩৩ থেকে ৫২ বছর এবং অন্যতম নমুনা হিসাবে গ্রহণ করা হয় তাদের উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ের খাদ্যাভ্যাস।
২২ বছর ধরে পরিচালিত গবেষণাটিতে দেখা যায় যে, ৮৭০ জন মহিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে যথেচ্ছভাবে কোমল পানীয় গ্রহণের কারণে ঋতুবতী হওয়ার পূর্বেই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ৪৯০ জন হয়েছেন ঋতুবতী হওয়ার পরে। অতএব এ ব্যাপারে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। (সূত্র: এনডিটিভির খাদ্য পাতা)
লেখক :সাংবাদিক, ইত্তেফাক
