বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
দর্শকদের হৃদয় ভেদ করে এমন ছবি প্রতিনিয়ত তুলছেন সিরিয়ায় ফটোগ্রাফার আব্দ আলকাদের হাবাক। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে হনন করতে যেমন ভয়ঙ্করভাবে গুলি বোমা ও যাবতীয় নৃশংসতার রসদ ব্যবহার করে এগিয়ে যায় সেনারা তেমনি ফটোগ্রাফাররা দু’হাতে ক্যামেরা তাক করে তুলে নেয় সেসব ভয়াবহ বিভৎসতার দৃশ্য। তা দেখে কখনো মানুষের বকু কাঁপে, বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু সিরিয়ার রক্তাক্ত প্রান্তরে বছরের পর বছর এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে ঘাতক রাষ্ট্র থেকে শুরু করে একাধিক মিত্র ও প্রতিপক্ষরা। তাই ভয়ঙ্কর সব ছবি একের পর এক ক্যামেরায় বন্দী হচ্ছে, নির্মমতার এ স্রোত চলছেই।
ভাষায় অবর্ণনীয় এসব ছবি প্রতিনিয়ত তুলছেন আব্দ আলকাদের হাবাক। ক্যামেরার কর্কশ শব্দ ও জ্বলে ওঠা ফ্লাশে সেসব ছবি জীবন্ত হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে তুরস্কে ভূমধ্যসাগরের সৈকতে শিশু এ্যালান কুর্দির সেই ছবি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও বিশ্বযুদ্ধের দামামা আজো বাজছে। গত বছর সিরিয়ার আলেপ্পোতে রক্ত ও ধুলা মাখা আরেক শিশু ওমরান দাকনিশ যখন এ্যাম্বুলেন্সে বসে বলেছিল, আল্লাহকে সব বলে দেবে সে, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠেছিল।
গত সপ্তাহে সিরিয়ার একটি গ্রাম থেকে বাসে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছিল সাধারণ মানুষ তখন এক বোমা বিস্ফোরণে ১২৬ জন নিহত হয়। সেখানেই ছবি তুলছিলেন আব্দ আলকাদের হাবাক। অনেক ভয়ঙ্কর ছবি তুলেছেন হাবাক। কিন্তু সেদিন আর পারলেন না। চোখের সামনে একটি শিশু বোমার আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে আর্তনাদ করে বাঁচতে চেয়েছিল শিশুটি। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তাকে কোলে তুলে নেন হাবাক। সিএনএন’কে হাবাক বলেন, শুধু আমি নই, সহকর্মী ফটোগ্রাফাররা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই, আর ছবি নয়, আহত শিশুদের আগে উদ্ধার করি। প্রথমেই হাবাক যে শিশুটির কাছে গেলেন, দেখলেন শিশুটি ততক্ষণে মারা গেছে। আরেকটি শিশুর কাছে দৌড়ে গেলেন হাবাক, চিৎকার করে কারা এসময় বললেন, সরে এস দ্রুত, সে মারা গেছে। কিন্তু শিশুটি তখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, হাবাক তাকে কোলে তুলে নিলে। তার ক্যামেরা সচল ছিল, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি উঠছিল তাতে। শিশুটি হাবাকের হাত শক্ত করে ধরে রাখল, হাবাকের দিকে তাকাল। হাবাক তাকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় দৌড়াতে লাগলেন।
আরেক ফটোগ্রাফার মুহাম্মদ আলরাগেব তখনো ছবি তুলছিলেন। দেখলেন একটি এ্যাম্বুলেন্সের দিকে শিশুটিকে নিয়ে হাবাক ছুটছিলেন। তার বাহুতে ক্যামেরাটি ঝুলছে। আলরাগেব বলেন, জবাবদিহিতার জন্যেই আমরা ছবি তুলি। কিন্তু সাংবাদিক হলেও আমরা মানুষ। কখনো কখনো ভয়াবহ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে শিশুদের পাশে ছুটে যাই।
হাবাক জানান, শিশুটির বয়স ৬ থেকে ৭ হবে। এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়ার সময় তখনো জানিনা শিশুটিকে বাঁচানো যাবে কি না। একটু পর ফের ছুটে আসি আরেক শিশুর কাছে। কিন্তু কয়টি শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করব, এ বোমা হামলায় ৬৮টি শিশু মারা গেছে। এক পর্যায়ে হাবাক ভেঙ্গে পড়েন। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কান্না আর চেপে রাখতে পারেননি তিনি। পাশেই আহত শিশুটি ততক্ষণে মারা গেছে। সিএনএন’কে হাবাক বলেন, আবেগকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি ও আমার সহকর্মীরা যা দেখি তা আসলে বর্ণনাতীত।
