স্টাফ রিপোর্টার ॥
আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে রবিবার শেষ হলো তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমা। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এ আখেরি মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহমাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়। এ সময় ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মধ্যাহ্নের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায় লাখ লাখ মুসল্লি আকুতি জানান। মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি ভারতের হযরত মাওলানা জমশেদ।
ভোর থেকে দিক-নির্দেশনামূলক বয়ানের পর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে। জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন মহান আল্লাহর দরবারে। কান্নায় বুক ভাসান তারা। ১৭ মিনিট ব্যাপী মোনাজাতে মাওলানা জমশেদ পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াত এবং উর্দু ভাষায় এ মোনাজাত পরিচালনা করেন। মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরও লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ।
রোববার সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছেন। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলি-গলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। রোববার ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরানো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পাশ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস- দোকানের ছাঁদে, যানবাহনের ছাঁদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সে দিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষ। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে সেই কাঙ্খিত আখেরি মোনাজাত। আখেরি মোনাজাতের জন্য রবিবার আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
বিদেশীদের অংশগ্রহণ- বিশ^ ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের (নিজামউদ্দিন মারকাজের) মিডিয়া সমন্বয়কারী মো. সায়েম জানান, ৫৯টি দেশের সাড়ে তিন হাজার মুসল্লি যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, জর্ডান, আরব আমিরাত, ইথুয়িপিয়া, আফ্রিকা, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশ থেকে ওই মুসল্লিরা অংশ নেন।
ভিআইপিদের আখেরী মোনাজাতে অংশগ্রহণ
এবারের বিশ্ব ইজতেমার সর্বশেষ আখেরী মোনাজাতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর মহানগরের পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম প্রমুখ বিশ^ইজতেমায় অংশ নেন বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর ইসলাম।
এছাড়া ইজতেমার বিদেশি নিবাসে ক্রিকেটার শাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম জোনায়েদ সিদ্দিকী, সোহরাওয়ার্দী শুভ, রাকিবুল হাসান, শাহরিয়ার নাফিজ প্রমুখ ক্রিকেটার বিশ^ইজতেমার শেষের আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন।
বিশ^ ইজতেমা ময়দানে দুই পর্বে ২৪ মুসল্লির মৃত্যু : বিশ^ইজতেমার কন্ট্রোল রুমে মিডিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মো. মনজুর রহমান জানান, গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ তীরে ৫৫তম বিশ^ ইজতেমার দুই পর্বে ২৪ মুসল্লি ইন্তেকাল করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনা, বার্ধক্য ও অসুস্থ্যজনিত কারণে এ ২৪জন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।
আগামী বছর মাওলানা সা’দ কান্দলভিকে নিয়েই ইজতেমা করতে চান তাঁর অনুসারীরা: আগামী বছর থেকেই মাওলানা সা’দ কান্দলভিকে নিয়ে টঙ্গীর ময়দানে ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা করতে চান তাঁর অনুসারীরা। এর আগেই উভয়পক্ষের বিরোধ মিটে যাবে বলেও আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শনিবার রাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ইজতেমা ময়দানে আলাপকালে চট্টগ্রামের লালখান জমিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা নায়েবে আমির মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরী এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মাওলানা সা’দ কান্ধলভির কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তিনি সে সব বক্তব্যের ব্যাপারে একটি সমাধানে পৌঁছানের পর আগামীতে টঙ্গী ইজতেমায় তাঁর যোগদানের পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন তাবলিগ সাথীরা। এদিকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও গাজীপুর সিটি মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম পর্বের ন্যায় ইজতেমার এ পর্বেও তাবলিগ জামাতের মুরব্বীদের সাথে ময়দানে নিবিড়ভাবে সময় দিয়েছেন। রাত-দিন তারা ময়দানে মুরব্বীদের সাথেই অবস্থান করেছেন। প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম শনিবারও ইজতেমা ময়দানে মুরব্বীদের সাথে রাত কাটান।
ইজতেমার মুরুব্বীদের বরাত দিয়ে তাবলীগ জমাতের নিজামউদ্দিন মারকাজের মিডিয়া সমন্বয়কারী মো. সায়েম জানান, আমাদের মতানৈকের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ইজতেমা। ধীরে ধীরে ইজতেমায় বিদেশী মুসল্লি আসা কমে যাচ্ছে। এ ভাবে চলতে থাকলে এটি আর বিশ^ ইজতেমা থাকবে না। তখন এটি বাংলাদেশের ইজতেমায় পরিণত হবে। আগে যেখানে শতাধিক দেশ থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার বিদেশী মুসল্লি আসতো এখন দুই পর্বে মাত্র আসছেন পাঁচ হাজারের মতো মুসল্লি। তাই ঐক্যবদ্ধ ইজতেমা খুব জরুরী।
সা’দ অনুসারিদের দুই পর্বের ইজতেমার তারিখ ঘোষণা
বিশ^ ইজতেমার মাওলানা জুবায়ের অনুসারীদের দুই পর্বের ইজতেমার তারিখ ঘোষণার পর রবিবার সা’দ অনুসারি পক্ষও আগামি ৫৬তম বিশ^ ইজতেমার পৃথক সময়ে দুই পর্বের তারিখ ঘোষণা করেছেন। রবিবার দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতের আগে ইজতেমার বয়ান মঞ্চ থেকে এ তারিখ ঘোষণা করা হয়। সা’দ অনুসারিদের ইজতেমা আয়োজক কমিটির শুরার বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ তারিখ ঘোষণা করা হয় বলে জানান ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী মোঃ সায়েম। ঘোষাণা অনুযায়ি আগামি ২৫, ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর ২০২০ প্রথম পর্ব এবং ১, ২ ও ৩ জানুয়ারী ২০২১ দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। আগামি ১৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানে সা’দ অনসুসারিদের পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে।
জোবায়ের পন্থীদের আগামি বিশ^ইজতেমার তারিখ
গত ১২ জানুয়ারি ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত শেষে মাওলানা জোবায়ের অনুসারিরা তাদের ইজতেমার দুই দফার তারিখ ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণা অনুসারে তাদের ইজতেমার প্রথম ধাপ হবে ৮, ৯ ও ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হবে ১৫, ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি।
মোনাজাত শেষে যানজটঃ আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী- কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাষ্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়ক গুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট।
গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি: বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরী মোনাজাত উপলক্ষে গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি ছিল। ফলে এবার এসব কারখানার শ্রমিকদের ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে সমস্যা হয়নি।
