Skip to content

বনের জমিতে রাজত্ব শিল্পপতিদের, নির্বাচিত প্রান্তিকদের উচ্ছেদ চলছে

> জবরদখলের তালিকা বিতর্কিত, বনবিভাগ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

> সচেতন মহলের প্রশ্ন আইন সবার জন্য সমান নয় কেন?

শাহান সাহাবুদ্দিন :

গাজীপুরের প্রাকৃতিক শালবনজুড়ে নির্মাণ হয়েছে কয়েক হাজার স্থাপনা টিনশেড ঘর থেকে শুরু করে বহুতল ভবন পর্যন্ত। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের অস্থিরতা পেরিয়ে এলেও থামেনি বনভূমি দখলের স্রোত। প্রশাসনের চোখের সামনে, বহু ক্ষেত্রে সরাসরি মদদে, একের পর এক বনভূমি গিলে খাচ্ছে বসতি, বাজার, এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রিসোর্টও।

ভাওয়াল রেঞ্জের ভবানীপুর বিটেই নয় মাসে গড়ে উঠেছে ৭০০ স্থাপনা। বনবিভাগের তালিকায় যদিও দেখা যাচ্ছে মাত্র ৪৫১টি ঘরবাড়ি, তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। পার্শ্ববর্তী বাউপাড়া বিটে নির্মিত শতাধিক ঘরের বিপরীতে তালিকায় আছে ৬৯টি। এমনই তথ্য এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।

বনবিভাগের তালিকা ও বাস্তবতা মেলে না

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু চন্দ্রা বিটেই নির্মাণ হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা, কিন্তু বন বিভাগের তথ্যে রয়েছে ১৩২৬টি। দুই দফা অভিযানের পরও সেখানে রয়ে গেছে এক হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা। শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, রাজেন্দ্রপুর ও কাচিঘাটা রেঞ্জের বিভিন্ন বিটেও একই চিত্র তথ্য গোপন, তালিকায় কারসাজি, এবং নির্বাচিত উচ্ছেদ।

গরিবের ঘর উচ্ছেদ, শিল্পপতিরা বহাল তবিয়তে

জেলার সচেতন মহলের অভিযোগ, বনের জমিতে গড়ে ওঠা অন্তত ১৮২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রিসোর্ট রয়েছে, কিন্তু তাদের ছোঁয়াও লাগেনি বনবিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে। বরং ভাঙা হচ্ছে প্রান্তিকদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। একদিকে কাঁদছে গৃহহারা মানুষ, অন্যদিকে শিল্পপতিরা বনজমি দখল করে গড়ে তুলছেন বিশাল স্থাপনা।

প্রশাসন ও বনবিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীনের নেতৃত্বে ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমে গতি নেই, দক্ষতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন গাজীপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “উচ্ছেদ আগে দরকার, তবে আশ্রয়হীনদের পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হবে। আমার নিজের ডিমার্কেশনের ফাইল চার বছর ধরে ঘুরছে।”

বনবিভাগে দুর্নীতি, ঘুষে মুছে যাচ্ছে নাম

অনুসন্ধান বলছে, জবরদখল তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ পড়ার ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত দখলদারদের অনেকে বাদ পড়েছেন, আবার ঘুষ দিয়েও কেউ কেউ উচ্ছেদ হচ্ছেন। অনেক বন কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন একই জেলায় “প্রাইজ পোস্টিং” হিসেবে। বন প্রশাসনের ভেতরেই এখন চেইন অব কমান্ড নেই বললেই চলে।

বন বিভাগ বলছে ভিন্ন কথা

বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত অবৈধ ঘরবাড়িগুলোর সংখ্যাই প্রকৃত। এর বাইরে যা বলা হচ্ছে, তা তারা “মনগড়া ও অযৌক্তিক” বলে দাবি করেছে। বন বিভাগ সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পরবর্তী দুই-তিন মাস ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ওই সময় বিভিন্ন রেঞ্জে দখলদারদের হামলার শিকার হয়েছেন অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পুলিশ প্রশাসনও পাশে দাঁড়াতে ভয় পেয়েছে। সেই সুযোগে একটি চক্র দখলের উৎসবে মেতে ওঠে এবং নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়।

ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল-আল-মামুন বাংলাভূমিকে বলেন, “আমরা তালিকা নির্ভুলভাবে তৈরি করেছি। উচ্ছেদ চলমান। কারসাজির সুযোগ নেই।” অন্যদিকে, ঢাকা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকন স্বীকার করেন, “জবরদখল তালিকা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কারও নাম বাদ পড়েছে কি না, খতিয়ে দেখা হবে।”

দুই ধরনের নীতিতে ক্ষোভ

সচেতন মহলের প্রশ্ন এক রাষ্ট্রে দুই বিধান কেমন করে চলে? আইন সবার জন্য সমান হলেও, বাস্তবে তা প্রয়োগে বৈষম্য প্রকট। গরিবের ঘর ভেঙে দিয়ে বনরক্ষা হচ্ছে না, শিল্পপতিদের সম্পদ দাঁড়িয়ে থেকে যাচ্ছে আইন ও প্রশাসনের ছায়াতলে।

আদালতেও চলছে মামলা, বিতর্কিত খতিয়ানে বাড়ছে জট

এসএ, সিএস খতিয়ানে ব্যক্তি মালিকানা থাকলেও আরএস-এ বনবিভাগের নামে থাকায় বহু জমি নিয়ে চলছে মামলা। এমন বিতর্কিত জমিতেও উচ্ছেদ চলছে, যা আরও আইনি জটিলতার জন্ম দিচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন এবং বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের (ঢাকা) বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারীর মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ সাড়া দেননি।

গাজীপুরের বনভূমি আজ শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে নয়, আইন-প্রশাসনের দায়হীনতার শিকারও বটে। প্রশ্ন শুধু একটাই—এই দখলের মিছিল থামবে কবে? আর সত্যিই যদি “জিরো টলারেন্স” হয়, তাহলে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা শিল্পপতিরা এখনো কেন নির্বিঘ্ন?

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫