মানুু সিদ্দিকী, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে:
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে যুগ যুগ ধরে ঠিকাদারসহ নানা পেশার ব্যবসায়ীরা পাহাড়ের আঞ্চলিক অস্ত্রধারী সংগঠনসমূহ টোকেন দিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হলেও ৫ আগস্টের নুতনভাবে যোগ হয়েছে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার আরোপিত চাঁদার খড়গ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় ভাবে কোনো গাছের ট্রাক হতে চাঁদা আদায় করার অভিযোগ না থাকলেও বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার নির্দেশে জেলার দীঘিনালা উপজেলায় উপজেলা বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন, জেলা বিএনপি নেতা আবু তালেব ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মোশাররফ হোসেন গাছ ও কাঠবাহী প্রতি ট্রাক হতে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছেন।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর দীঘিনালা উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট, বাজার ফান্ডের একাধিক প্লট জবরদখল, তার ভাই জসিমকে মেরে মৃত ভেবে ফেলে রেখে ভিডিও করে কোটি টাকা চাঁদা আদায়, গরুর খামারের গরু ছিনতাই করে জবেহ করে গোশত ভাগ-বাটোয়ারা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্লাসের চিত্র প্রচার ও ৫০ ট্রাক গাছ লুটপাট করে একদিনেই কোটিপতি বনে যান ওয়াদুদ সিন্ডিকেটের এসব সদস্য। দীঘিনালায় ওয়াদুদ ভূঁইয়া এক দলীয় প্রোগ্রামের জন্য একদিনেই জয়নাল চাঁদা আদায় করেন প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। যার বিরুদ্ধে দীঘিনালা উপজেলা বিএনপি নেতা মোতালেব এক বৈঠকে প্রতিবাদ করে বক্তব্য দিয়ে ভিডিও ফেইসবুক পোস্ট করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।
এদিকে ৫ আগস্টের পর পরই দখল করে নিয়েছেন খাগড়াছড়ি কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, খাগড়াছড়ি শান্তি পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন ও ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি, চেম্বার অব কমার্সসহ খাগড়াছড়ি বাজার ব্যবসায়ী সমিতি। ক্ষমতা হস্তান্তর অর্পণ বা নির্বাচন ব্যতিরেকে পূর্বের দায়িত্ববান সভাপতি সম্পাদকদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করে কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হিসেবে জনৈক জসিম উদ্দিনকে ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. শাহ আলমকে বসিয়ে লাখ লাখ চাঁদাবাজির ধান্দাবাজি চালানো হচ্ছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী দোসর মারিশ্যার বেলালকে বসিয়েছেন চেম্বার অব কমার্সের কমিটিতে। জনৈক আসলাম কালু যিনি খাগড়াছড়িতে স্থায়ী নন, ছাগলনাইয়ার বাসিন্দা- তাকে এনে পরিবহণ সেক্টরের চারটি সংগঠন দখল করে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এভাবেই ফুল ঝাড়ুর ব্যবসা থেকে শুরু করে বালুমহাল জবর দখল করে লুটপাট ও দখলবাজির ফন্দি ফেঁদে বসেছে ওয়াদুদ সিন্ডিকেট।
বাজার ব্যবসায়ী নন, জনৈক মো. ইউনুছকে জোরপূর্বক খাগড়াছড়ি বাজার ব্যবসায়ীর সভাপতি পদে বসিয়েছেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। জেলা যুবদল নেতা ইব্রাহিম দেখতে না দেখতেই হয়ে ওঠেছেন বালু মহালের অঘোষিত সম্রাট। জেলার একাধিক পয়েন্টের বালুমহাল এখন তার নিয়ন্ত্রণে। ফলে এক সময় ট্রাক্টরের হেলপার এখন কোটিপতি বনেছেন রাতারাতি। জবর দখল করে নিয়েছেন ট্রাক্টর মালিক সমিতির অফিসও। তার বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতা শাহাদাতের গঞ্জপাড়াস্থ এলাকায় লক্ষ লক্ষ টাকার ভূমি রাতারাতি জবরদখল, আওয়ামী লীগ নেতা আকতার হোসেন, মংসুইপ্রু চৌধুরীসহ একাধিক নেতার সাথে মামলা বাণিজ্য করে কোটিপতি বনে যাবার অভিযোগ বিস্তর।
জেলা শহরের পর্যটন মোটেল এলাকায় ইব্রাহিম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবসারের বেয়াই কাইয়ুম ও তার পুত্র যুবদল নেতা সাগর নোমানের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে শাসিয়ে বড় কয়েকটি পাহাড় কেটে সাবাড় করার অভিযোগ রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, জনৈক ইটভাটা মালিক মোস্তফা কোম্পানি ও সাবেক পৌরসভার কর্মচারী নব্য কোটিপতি ছোট বাবলুকে দিয়ে জেলার একাধিক ব্যবসায়ী ও নেতাকর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা কালেক্ট করানো হচ্ছে। জনশ্রুতি রয়েছে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল্যা থেকে ৫৫ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। চাঁদা না দিলে পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরীর চায়না স্টাইলের কোটি টাকার বাড়ি নিমিষেই লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে গোটা জেলা জুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে, চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে এ ঘটনাকে উদাহরণমূলক হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সুযোগ সন্ধানী ওয়াদুদ ভূঁইয়া-আবছার সিন্ডিকেট ৫ আগস্টের পর পুরো জেলায় চাঁদাবাজির কালেক্টর নিয়োগ দিয়ে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে চলছেন। বালুমহালসহ সকল সেক্টর জবরদখল করে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর চালাচ্ছেন অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার। গত ১০ মাসেই প্রায় ৭০টি মামলায় ১০ সহস্রাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হয়রানির পাশাপাশি বিএনপির সমীরণ ও ফরহাদ গ্রুপের ৪ সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। আর যারা এলাকায় রয়েছেন তাদেরও আওয়ামী লীগের দোসর তকমা দিয়ে ওয়াদুদ অনুসারীরা চাঁদার খড়গ চাপিয়ে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে মিথ্যা মামলায় দুই লাখ টাকা চাঁদা দিয়েও বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ জেল খেটেছেন। আর এখনো জেলে আছে খাগড়াছড়ির হিন্দু ব্যবসায়ী শিব শংকর দেব। কথিত রয়েছে বাবু শিব শংকর দেব দুদফায় ৫৭ লাখ টাকা ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে চাঁদা দিয়েছিলেন। কিছু দিন ব্যবসা বাণিজ্য করার পর আবারো তার কাছ থেকে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। না দেয়াতে এখন তিনি জেলে। অপর দিকে খাগড়াছড়ির বিলাশ বহুল মার্কেট সেলিম ট্রেড সেন্টার এর মালিক বিএনপি নেতা মো: সেলিমকে মার্কেটের অর্ধেক ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে লিখে দেবার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হলে তিনি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম, জেলা পরিষদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগ নেতা খোকনেশ্বর ত্রিপুরা, জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ্যাড. আশুতোষ চাকমা, সিনিয়র সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী, মেরুং ইউপির নারী চেয়ারম্যান মাহমুদা বেগম লাকীসহ ছাত্রলীগ, যুবলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত নন কিন্তু চাঁদা না দেয়ায় প্রতিহিংসামূলক মামলায় জেলহাজতে রয়েছেন কয়েকশ ব্যক্তি।
দখল-চাঁদা-লুটপাটে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা
আপডেট :June 5, 2025
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
