স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুর সদর উপজেলায় বিতর্কিত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুস সালামের চাঁদপুর মতলবের পরিবর্তন পরিবর্তে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বদলির আদেশ হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পচিালক (প্রশাসন—২) মো: সাজ্জাদ হোসেন এক অফিস আদেশে গাজীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো: আব্দুস সালামকে চাঁদপুরের মতলবে ও মতলবের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাজমুন নাহারকে গাজীপুর সদরে বদলীর আদেশ দেন। আদেশে উভয়ে ২০ আগস্টের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে ২১ আগস্টে স্ট্যান্ড রিলিজের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ২০ আগস্টের মধ্যে নাজমুন নাহার মতলবের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গাজীপুর আসতে চাইলে তাকে নানা ধরণের গুজবি খবর দিয়ে অনাকাংখিতভাবে যোগদানে বাঁধাগ্রস্থ করা হয়। আব্দুস সালাম মতলবে বদলির আদেশের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ন্যায় বিচার চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আব্দুস সালামকে মানবিক কারণে ঢাকা বিভাগে যেকোনো থানায় বদলি করার সুপারিশ করেন। তারই ধারাবাহিকতা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আব্দুস সালামকে ৬/১০/২০২৫ তারিখ থেকে মতলবের পরিবর্তে পলাশ, নরসিংদীতে বদলির আদেশ দেন। আদেশে বলা হয় ৮ তারিখের মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে পলাশে যোগদান করার জন্য, এর মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিলে ৯ তারিখ থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ হিসাবে গণ্য হবে। নতুন শিক্ষা অফিসার আসার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষার অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার দিলারা রহমান। তবে একটি সূত্র জানান, বুধবার গাজীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে আব্দুস সালাম বিদায় নিয়েছেন।
এদিকে আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগে দৈনিক বাংলাভৃমিসহ গণমাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে স্কুল নিবন্ধনের নামে ঘুষ আদায়, শিক্ষক নেতৃবৃন্ধকে পুলিশ দিয়ে হয়রানীসহ নানা ধরণের অভিযোগ উঠে। ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত একাধিক অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে অধিদপ্তর। আব্দুস সালাম গাজীপুরে কর্মরত থাকা অবস্থায় গাজীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। আব্দুস সালামের বিদায়ের পর শত শত শিক্ষক স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
প্রসঙ্গত: গাজীপুর সদর উপজেলায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দ, শিক্ষক বদলি কিংবা বিদ্যালয় পরিদর্শন, সব ক্ষেত্রেই মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে।
কথায় কথায় শিক্ষকদের দেন বাধ্যতামূলক বদলির হুমকি; দপ্তরিদের ঈদ বোনাস থেকে ৫০০ টাকা করে ঘুষ নেওয়া, নিয়ম বহির্ভূতভাবে অফলাইনে বদলি, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পাঠদানের অনুমতি, সর্বশেষ যে বিষয়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে সরকারের অনুমতি না থাকলেও নিজ উদ্যোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফি নেয়া। যা প্রাথমিক বিদ্যালয় অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুস সালাম গত ১২ জানুয়ারি গাজীপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা, রংপুরের গাইবান্ধা জেলা সদর, রাঙামাটির জেলার বরকল উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আগের প্রতিটি স্টেশনে তিনি দুর্নীতির সম্পৃক্ততার অভিযোগে কোথাও গ্রেড অবনমন আবার কোথাও শাস্তিমূলক বদলি হয়েছেন। কোথাও আবার দুর্নীতির অভিযোগে শিক্ষক ও এলাকাবাসী তার কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মো. আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩ (খ), ও ৩ (ঘ) মোতাবেক অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয় ২০১৮ সালে। ২০১৯ সালে এ বিষয়ে অভিযোগনামা প্রেরণ করে তার জবাব চাইলে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশও নেন তিনি। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব নাজমা শেখকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
তদন্তে তার দুর্নীতি ও অনিয়মের দালিলিক প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্তকারী ওই কর্মকর্তা। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সালামকে দুর্নীতির অভিযোগে বিধি ৪(৩)খ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে ফের তার বক্তব্যের জন্য জবাব চায় কর্তৃপক্ষ।
মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে প্রমাণিত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম দ্বিতীয়বারও জবাব দেন। মামলায় আনিত সবগুলো অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়; কিন্তু মানবিক কারণে চাকরিচ্যুতির পরিবর্তে একই বিধিমালায় বিধি ৪(৩)(ক) অনুযায়ী ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে নামিয়ে তাকে নবম গ্রেডে অবনমিত করা হয়।
৫ বছর পর্যন্ত এ আদেশ বলবৎ থাকার কথা বলা হয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ স্বাক্ষরিত আদেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় এই শাস্তি দেওয়া হয় আব্দুস সালামকে।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কটূক্তি, শিক্ষক বদলিতে অনিয়ম, বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন বাণিজ্য, বই বিতরণে বৈষম্যসহ নানান অভিযোগে কয়েক দফা সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে।
গাজীপুরের সচেতন মহল মনে করে, শিক্ষার ভিত মজবুত করার লক্ষ্যে সর্বাগ্রে প্রাথমিক শিক্ষার সব ধরনের দুর্নীতি দূর করা প্রয়োজন। আগামী প্রজন্ম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক এ চাওয়া সবার। শিক্ষায় অবহেলা জাতির মারাত্মক ক্ষতি করে। এ ক্ষতি জাতিকে বিকলাঙ্গ করে তোলে। অর্থের দুর্নীতি কিছু সময় পর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু শিক্ষায় দুর্নীতি আগামী প্রজন্মকে দুর্বল করে ফেলে। এ দুর্বলতা জাতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। তাই গাজীপুরের সচেতন মহলের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত করে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় নিবে।
অবশেষে গাজীপুর থেকে বদলী হলেন বিতর্কিত শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম!
আপডেট :October 8, 2025
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
